আয়কর ও আয়করের ইতিহাস

আয়কর বিষয়টি আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশের যে কোন আয়ের মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এটি যেহেতু নিয়মিত বিষয় তাই করদাতাদের এই বিষয়ে একটু মনোযোগ দেয়া দরকার। যত দিন যাচ্ছে আমরা ততই অনলাইনভিত্তিক/ অটোমেশন/ প্রমাণভিত্তিক সময়ের দিকে যাচ্ছি, যেখানে মূলত সত্য ও সঠিক তথ্য নির্ভর কার্যাবলিগুলোই সঠিক ভাবে মূল্যায়িত হবে। আপনার আয়, ব্যয়, দায়, সম্পদ সরকার জানবে এটাই স্বাভাবিক। এই প্রক্রিয়ার জন্যই রিটার্ন এর আবির্ভাব। সাধারনত প্রতিটি দেশে আয়কর একটি আইন দ্বারা পরিচালিত হয়। আমাদের দেশেও তাই ৪ই জুন ১৯৮৪সালের আয়কর অধ্যাদেশ ও এর পরবর্তী সংশ্লিষ্ট সংশোধন দ্বারা আয়কর সম্পর্কিত সকল কার্যাবলি সম্পূর্ন হয়ে থাকে। যদিও এই আলোচনায় আমরা মূলত জানবো,আয়কর কি,কেন তা দিতে হয় এবং এর ইতিহাস।

তুলনামূলক কম সম্মানিতে আমদের সেবা নিতে ও জানতে ক্লিক করুন এখানে

মূল আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে একটি বিষয় জেনে নিই এবং সতর্ক হই। আয়কর এবং আয়কর রিটার্ন- অনেকে এটি নিয়ে সারা বছর অনেক চিন্তা ভাবনা করার পর সাধারণত শেষ সময়ে অর্থাৎ নভেম্বর মাসে বা নভেম্বর মাসেরও শেষে এসে তরিঘরি করে বিষয়টি সমাধান করার চেষ্টা করেন। তখন বিষয়টিতে যতটা গুরুত্ব দেয়া দরকার ঠিক ততটা দেয়া হয়না।এক্ষেত্রে অনেক করদাতা আছেন যারা পূর্বে আইটিপি বা আয়কর পারদর্শিদের কাছে না গিয়ে নিজে নিজে বা ভুল ভাবে রিটার্ন সাবমিট করেন, ফল স্বরুপ পরবর্তীতে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হন। তাই রিটার্নে সঠিক তথ্য দেয়া, সঠিক ফার্ম বা সঠিক আইনজীবির পরামর্শ নেয়া খুবই জরুরি একটি বিষয়। করদাতাদের আরো জেনে রাখা দরকার যে,যারা ভুল তথ্য দিয়ে ভুলভাবে রিটার্ন সাবমিট করতে বলে, পরবর্তিতে সংকটের সময় তারা থাকে না বরং করদাতাকেই তা সমাধান করতে হয়। এসব ক্ষেত্রে কি ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় তা নিয়ে অন্য একদিন আলোচনা করব। এবার আজকের মূল-আলোচনায় আসি। আয়কর কি, কেন তা দিতে হয় এবং এর ইতিহাস।

আমাদের অনেকেরই জানা যে, ইংরেজি Tax শব্দের অর্থ কর। আবার Chambers English Dictionary তে Tax এরঅর্থ, A contribution exacted by the state অর্থাৎ “রাষ্ট্র কর্তৃক জোর করে আদায়কৃত অর্থ কে কর বলে। তাহলে এই ভাবে বলা যায়, “কর হলো সরকার কর্তৃক জনগণের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক ভাবে আদায়কৃত অর্থ। এক কথায় আয়ের উপর করই হল আয়কর। অন্য ভাবে বললে, আয়কর আইনের আওতায় এক বা একাধিক উৎস হতেকোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয়ের উপর আরোপ যোগ্য বার্ষিক করকে আয়কর বলে। ব্যবসায় শিক্ষা ও অর্থনীতির স্টূডেন্টদের (ছাত্রদের) নিকটপরিচিত, অধ্যাপকএ্যাডামস্মিথ, ডেভিড রিকার্ডো প্রমুখেরমতে, “কর হলো এমন এক ধরনের কোটা (quota) যার দ্বারা প্রতি টি নাগরিক সরকারি সেবার খরচ কেসামনে রেখে প্রদান করে থাকে”।সরকারি, বেসরকারী, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ও এর কর্মচারী এবং কর্মকর্তাদের উপর সাধারণত আয়কর আরোপ করা হয়।

আয়কর হচ্ছে সরকারি রাজস্ব বা আয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সাধারণ অর্থে যা দের উপর কর আরোপ করা হয় তাদেরকে বলা হয় করদাতা। আয়ের প্রধান উৎস ৭টি :১. বেতন থেকে আয়।২. সিকিউরিটি থেকে আয়।৩. গৃহসম্পদ থেকে আয়। ৪.কৃষিথেকেআয়। ৫. ব্যবসায় থেকে আয়। ৬. মূলধনী অর্জন থেকে আয়। ৭. অন্যান্য উৎস থেকে আয়। উল্লেখিত সবগুলো বিষয়ের পৃথক পৃ্থক বর্ণনা আমাদের ওয়েবসাইটে (www.taxinfobd.com) রয়েছে, আরো জানতে ভিজিট করতে পারেন। একটি নির্দিষ্ট আয় সীমা পর্যন্ত আয়ের উপর কর দিতে হয় না, তার উপরের আয় থেকে কর দিতে হয় এবং এই সীমা প্রতি বছর পরিবর্তনশীল।

প্রতিটি দেশের সরকারি ব্যয় নির্বাহের সরকারি আয়ের সাধারণত প্রধান খাত আয়কর। তাই এটি বিশ্বের বেশির ভাগ সরকারের আয়ের প্রাথমিক উৎস। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে, এই অর্থ দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন করা এবং জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা বজায় রাখার জন্য ব্যয় করা হয়, যার মধ্যে আমরা যে রাস্তা গুলিতে ভ্রমণ করি তা সহ, স্কুল, কলেজ ও জরুরী পরিষেবা এবং কল্যাণ কর্মসূচির মতো সরকারী পরিষেবা গুলির অর্থায়ন করে। বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায় সরকারি আয় ও ব্যয়ের খাত সম্পর্কে। নিম্নে ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরের সরকারি আয়ের একটি গ্রাফ দেয়া হল।

২০২২-২০২৩ অর্থ বছরের সরকারি আয়ের চিত্র

বার জেনে নি আয়করের ইতিহাস নিয়ে। আয়কর আইন ঠিক কোথায় এবং কখন উৎপত্তি হয়েছে তা একবাক্যে বলা না গেলেও এটা বলা যায় যে, যখন থেকে রাষ্ট্র ব্যবস্থার উৎপত্তি তখন সরকারের বা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সরকারি আয়ের একটি অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে আয়কর আইনের উৎপত্তি হয়েছে।

১৭৯৮ সালে বৃটিশ প্রধান মন্ত্রী উইলিয়াম পিট দি ইয়াংগার সর্ব প্রথম আধুনিক আয়কর ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। আর এজন্যে Willium pitt the Younger কে আধুনিক আয়করের জনক ও বলাহয়। তবে জানা যায়, তার আয়কর আইন প্রবর্তনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল নেপোলিয়নের যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করা। ১৭৯৯ সালের জানুয়ারী মাস থেকে এটি কার্যকর করা হয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে বৃটেনের বাইরেই উরোপে আয়কর আইন প্রথমে চালু করা হয় জার্মানীতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহ যুদ্ধ চলা কালে ১৮৬২ থেকে ১৮৭২  সাল পর্যন্ত কর ব্যবস্থার প্রচলন ছিল।

আমাদের ফেইসবুক পেইজ লিঙ্ক এখানে
https://www.facebook.com/taxinfobangladesh

ভারতীয় উপমহাদেশে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পর ইংরেজদের কোষাগারে প্রচণ্ড অর্থসংকট দেখা দেয়। রাষ্ট্রীয় খরচ মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমন প্রেক্ষাপটে ইংরেজশাসকেরা ১৮৬০ সালে এ উপমহাদেশে প্রথম আয়করের ইতিহাসের যাত্রা শুরু করে যা একটানা ০৫ বছর যাবৎ চলমান ছিল। তবে সিপাহি বিপ্লবের পর কোষাগারের অর্থ সংকট কাটিয়ে উঠার পর সমালোচনার মুখে পরের দুই বছর এই আইনটি স্থগিত ছিল।

জানা যায় ভারতের প্রথম ফাইন্যান্স মেম্বার জেমস উইলসন আইন সভায় আয়কর বিল উত্থাপন করলে ইংরেজ শাসকেরা তা পাস করেন।ওই আয়কর আইনে ২০০টাকা পর্যন্ত বার্ষিক আয়কর মুক্ত ছিল। তখন ২০০ থেকে ৪৯৯ টাকা পর্যন্ত ২ শতাংশ এবং এর বেশি আয় হলে ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হতো। তবে কৃষিখাতের আয় ৬০০টাকা পর্যন্ত কর মুক্ত ছিল।

কিন্তু ১৮৬৭ সালে এসে আবার বাজেট ঘাটতিতে পড়লে তৎকালীন সরকার আবারও অনেকটা বাধ্য হয়ে আইন সভায় আবার আরেকটি আয়কর আইন করে। এ আইনটিও একটানা ০৫ বছর চলে অবশেষে ১৮৭৩ সালে বাতিল করতে হয়। পরবর্তিতে ১৮৭৭-৭৮ সালে দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে আবারও পূর্বের আয়কর আইনটি বলবৎ করা হয়। পরবর্তিতে ১৮৮০ থেকে ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত এই সময়ে কর–সংক্রান্ত ২৩টি আইন প্রণয়ন করা হয়।

১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সারা পৃ্থিবীর ন্যয় ভারতীয় উপমহাদেশের অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে নতুন আয়কর আইনটি ব্যাপক ভাবে সংশোধন করে ১৯২২ সালে প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ আয়কর আইন প্রণয়ন করে ইংরেজ সরকার।

১৯২২ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এই আইনটি চলতে থাকে। ১৯৪৭ সালে বৃটিশ ভারত বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি  স্বাধীন দেশের জন্ম হওয়ার পর উভয় দেশই ১৯২২ সালের আয়কর আইন টি গ্রহণ করে। পাকিস্তান সরকার ১৯৫৯ ও ১৯৬৫ সালে ১৯২২ সালের আয়কর আইনের কিছু ধারা ও উপ ধারা সংশোধন ও সংযোজন করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯২২ সালের আয়কর আইন টি গ্রহণ করে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার একটি কর অনুসন্ধান কমিশন গঠন করেন। এ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে ১৯২২ সালের আইন্ টি বাতিল করে ১৯৮৪ সালে আয়কর অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এ আইন্ টি ১৯৮৪ সালের পহেলা জুলাই থেকে কার্যকরি হয়। যা এখনো বলবৎ আছে। এ আইনের মাধ্যমে ই আমাদের দেশের আয়কর আইনের প্রয়োজনীয়  সংশোধন ও সংযোজন করা হয়ে থাকে।

2 thoughts on “আয়কর ও আয়করের ইতিহাস”

Comments are closed.